২০১২ সাল, জুন মাস। বয়স তখন সবে ২২ বছর ৬ মাস।
কিছু স্বপ্ন থাকে যেগুলো মনের গভীরে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, সেগুলোকে ভুলে থাকা যায় না, আবার পূরণ হবে ভেবেও সাহস পাওয়া যায় না। আমার কাছে সেই স্বপ্নটার নাম ছিল—আল্লাহর ঘর। কাবা শরিফের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো, মদিনায় গিয়ে মসজিদে নববি দেখা। অনেক আগে থেকেই মনের কোণে এই ইচ্ছাটা লালন করে আসছিলাম, ২০১০ সালের দিকে যখন আমার ফুফাত ভাই মুফতি উবাইদুল্লাহ শাকির পবিত্র হজ পালন করেছিলেন তখন থেকে ইচ্ছাটা প্রবল হতে থাকে। কিন্তু শুধু ইচ্ছা করলেই তো আর সব কিছু হাতের মুঠোয় চলে আসে না।
তখন আমি ফ্রিল্যান্সিং, সাথে যশোর থেকে সপ্তাহে ৩/৪ দিন গিয়ে ইসলামী বিশ্বাবিদ্যালয় কুষ্টিয়াতে ক্লাস করা। প্রতিদিনের সংগ্রাম —এর মধ্যেই একদিন আমার শাশুড়ি আম্মা এসে বললেন,
—”তোমার শ্বশুর তো উমরাহ করতে যাবে গ্রুপ নিয়ে। তুমি যাবে নাকি?” সেদিন আমি শশুর বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম।
(আমার শ্বশুর ১৯৯৯ সাল থেকে মুয়াল্লিম হিসেবে কাজ করছিলেন।)
মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভেতর কী যে একটা অনুভূতি খেলে গেল, বলে বোঝানো কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা মাথায় রেখে বললাম,
—”আল্লাহ তা’আলা যদি এই মাসের মধ্যে হাজার ডলারের কাজ পাইয়ে দেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ যাব।”
কথাটা মুখ থেকে বেরিয়েছিল প্রায় নিজের অজান্তেই, একরকম আল্লাহর কাছে চাওয়া। অথচ মাত্র তিন-চার দিনের মধ্যেই এত কাজ এসে হাজির হলো যে, নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। এই আকস্মিক প্রাচুর্য দেখে মনে হলো, এটা নেহাত সাধারন বিষয় নয়—এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা ইশারা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম—যাবই ইনশাআল্লাহ।
এরপর পাসপোর্ট বানানোর তোড়জোড় শুরু হলো। আলহামদুলিল্লাহ, একে একে সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। ২০১২ সালের জুন মাসে শ্বশুরের সঙ্গে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যশোর থেকে ঢাকার পথে রওনা হলাম। বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত টানাপোড়েন—আনন্দ, উত্তেজনা, আর সামান্য অজানা ভয় একসঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল।
ঢাকায় পৌঁছেই ভেবেছিলাম, এবার বুঝি সব হাতে চলে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো আসলে অনেক কিছুই গোপন রাখে/ মিথ্যে ও বলে—এটা তখন হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম (যদিও আজ নিজেই ফ্লাইরিহলাহ এভিয়েশন পরিচালনা করছি, তাই সেই দিনগুলোর কষ্টটা আরও ভালো বুঝি এজন্য কারো পাসপোর্ট আটকে রাখিনা আবার টিকিট এবং ভিসা এয়ারপোর্টে গিয়ে দেই না। বরং বহু আগে দিয়ে দেই যেন আমার মত সিচুয়েশন ক্রিয়েট না হয়)।
প্রায় দুই দিন কেটে গেল টিকিট আর ভিসার অপেক্ষায়। সময় গড়াচ্ছিল, কিন্তু হাতে কিছুই আসছিল না। একটা পর্যায়ে মনের ভেতর একটা চাপা কষ্ট জমতে শুরু করল। বারবার মনে হচ্ছিল—
এতদূর এসেও কি আবার যশোরে ফিরে যেতে হবে?
মক্কায় আর বুঝি যাওয়া হবে না।
উমরাহ করা হবে না—এই আক্ষেপ নিয়েই কি ফিরতে হবে?
সেই দুই দিনের অপেক্ষা যেন দুই মাসের সমান মনে হচ্ছিল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা! অবশেষে টিকিট আর ভিসা হাতে এলো। মুহূর্তেই সব দুশ্চিন্তা যেন উবে গেল। এবার সত্যিই রওনা হওয়ার পালা।
আমাদের ফ্লাইট ছিল তৎকালীন RAC Airways-এ, ট্রানজিট ছিল রাস আল খাইমায়। সেখানে নেমে ইহরাম পরিধান করলাম। সাদা দুই টুকরো কাপড় গায়ে জড়াতে জড়াতে বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল—এই সাদা কাপড়ই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এখন থেকে আমি আর সাধারণ কেউ নই, আমি একজন মুসাফির, আল্লাহর ঘরের অতিথি হওয়ার পথে।
এরপর আবার বিমানে উঠলাম, এবার গন্তব্য জেদ্দা।
আজ এতগুলো বছর পর বসে ভাবলে বিষয়গুলো খুব স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু তখন, সেই ২২ বছর বয়সে, পুরো ব্যাপারটাই ছিল স্বপ্নের মতো। জীবনের প্রথম বিদেশ সফর, প্রথম উমরাহ—সব মিলিয়ে হৃদয়ে এক অন্যরকম কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল।
জেদ্দায় পৌঁছে সেখান থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাসে উঠেও যাত্রা শুরু হতে কিছুটা সময় লাগল। তারপর যখন পথের মধ্যে সেই বিখ্যাত “কুরআন ও রেহালের গেট” পার হচ্ছিলাম, বুকের ভেতর যে অনুভূতিটা হয়েছিল, তা আজও কোনো শব্দে, কোনো লেখায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। মনে হচ্ছিল, আমি এক অদৃশ্য সীমারেখা পার হয়ে এমন এক জগতে প্রবেশ করছি, যেখানে সময় অন্যরকমভাবে বয়।
মক্কায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। গাড়ি থেকে নামার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। শ্বশুর হোটেল বুকিং করে আমাদের নিয়ে সেখানে গেলেন।
শরীর তখন প্রচণ্ড ক্লান্ত—সত্যি বলতে, ভীষণ ক্লান্ত। কিন্তু এতদিনের লালিত স্বপ্নের জায়গায় এসে কি শুধু হোটেলে গিয়ে শুয়ে থাকা যায়? মন কিছুতেই মানছিল না।
গাড়ি থেকে নামতেই দেখা হয়ে গেল আমার ছোট চাচা মাওলানা আব্দুল্লাহর সঙ্গে, যিনি তখন উমরাহ পালনের জন্য মক্কায় ছিলেন (ফোনে কন্টাক করেছিলাম)। শ্বশুর আব্বুরা সেদিন রাতে গ্রুপসহ উমরাহ করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। কিন্তু ছোট চাচাকে দেখে আমি তর সইতে পারলাম না—তাঁর সঙ্গেই মসজিদুল হারামের দিকে রওনা দিলাম।
হাঁটতে হাঁটতে গায়ে বারবার কাঁটা দিয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, নিজেকে বারবার জিজ্ঞেস করছি—সত্যি কি আমি এখন হারামে?
যখন চোখের সামনে পবিত্র কাবা ভেসে উঠল, সেই মুহূর্তে আমি যেন আর নিজের মধ্যে ছিলাম না। শরীর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেও মন যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ। তখন এখনকার মতো স্মার্টফোন ছিল না, তাই সেই ঘরটাকে দেখতাম লাল প্লাস্টিকের ক্যামেরায় (হাজীগন মক্কা থেকে যা দেশে নিয়ে যেত)—সরাসরি কাবা ঘর দেখার সেই দৃশ্য চোখের ভেতর আজও অমলিন।
আমার প্রথম উমরাহটা এভাবেই হয়েছিল—নিজে নিজে। ছোট চাচা মাওলানা আব্দুল্লাহ আমাকে তাওয়াফ, সাঈ করতে পাঠিয়ে দিয়ে উমরাহ গেটে অপেক্ষা করছিলেন। ফলে শ্বশুর আব্বুদের সঙ্গে সেই রাতে গ্রুপের উমরাহে আমার আর অংশ নেওয়া হয়নি। আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, নিজে নিজে ওভাবে উমরাহ করাটা হয়তো আমার একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ কাবা দেখে আমি নিজের মধ্যেই ছিলাম না, আর ইবাদাতটাও ছিল আমার জন্য একদম নতুন (যদিও কিতাবের পাতায় অনেক পড়েছি, কিন্তু প্রাক্টিক্যাল প্রথম)। তাই সেটা যথাযথভাবে আদায় হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন আজও মনে খচখচ করে। আল্লাহ যেন কবুল করে নেন। আমীন
উমরাহ শেষ করতে করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে আমি প্রচণ্ড ক্লান্ত, সঙ্গে প্রচণ্ড ক্ষুধাও। মসজিদুল হারামের ভেতরে বাদশাহ আব্দুল আযীয গেটের কাছে একটু গা এলিয়ে দিয়েছিলাম, শরীর আর চলছিল না। কিন্তু সামান্য সময়ের ব্যাবধানে পুলিশ এসে সেখানে শুতে দিল না।
কী আর করা! হেঁটে হেঁটে একটা বাঙ্গালী খাবারের হোটেলে গিয়ে পেট ভরে খেলাম। তারপর রওনা দিলাম নিজের হোটেলের দিকে—তখন আমাদের হোটেল ছিল ইব্রাহিম খলিল রোডের পূর্ব পাশে, হিজরা রোডে।
হোটেলে পৌঁছে দেখি রুমে তালা। শ্বশুর হাজীদের নিয়ে উমরাহ করতে গিয়েছেন, চাবিও তাঁর কাছে। রুমে ঢোকার কোনো উপায় নেই। এত ক্লান্তি নিয়ে আর কিছু ভাবার শক্তিও ছিল না—রিসেপশনের সোফার উপরই গা এলিয়ে দিলাম।
এরপর কী হয়েছিল, বিশ্বাস করুন, আজও ঠিক মনে করতে পারি না। কে আমাকে সেই সোফা থেকে তুলে রুমে নিয়ে গিয়েছিল, তাও স্মরণ নেই। সম্ভবত শ্বশুর আব্বুরা উমরাহ শেষে ফিরে এসে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি এতটাই গভীর ক্লান্তিতে ডুবে ছিলাম যে, হয়তো ঘুমের মধ্যেই আমাকে রুমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
আজও এই ঘটনাটা মনে পড়লে নিজের অজান্তেই হাসি পায়, মনে হয় সকলে মিলে কোলে করে কি রুমে নিয়েছিলো কিনা 😂। জীবনের প্রথম উমরাহ করতে গিয়ে এমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, হোটেলের রিসেপশনে ঘুমিয়ে পড়েছি—আর কে আমাকে রুমে নিয়ে গেল, সেটাও জানি না!
মক্কায় থাকাকালীন আমার একটা নিজস্ব অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল। হারামের ৮৭ নম্বর বাদশা ফাহাদ গেট দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে এগোলে একটা গেট পড়ত, যেখান থেকে মাতাফের প্রান্তরটা চোখে পড়ত। ঠিক তার বাম পাশেই ছিল স্টিলের জালি টাইপের একটা চারকোনা ঢাকনা। আমার বাবা ২০১০ সালে (এতেকাফে বসার সময় ঠিক) এই জায়গাটায় বসেই অজু করতেন—এই কথাটা তিনি আগে থেকেই আমাকে জানিয়েছিলেন। তাই মক্কায় থাকার দিনগুলোতে আমি নিজে খুঁজে সেই জায়গাটায় গিয়ে বসতাম, সেখানে বসে ইবাদাত করতে ভালো লাগত। হয়তো এটা নিছক একটা জায়গায় বসে থাকা ছিল না—বাবার প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই টানটা তৈরি হয়েছিল।
এরপর যথারীতি মক্কায় কয়েক দিন কাটালাম। বিভিন্ন জায়গা জিয়ারত করলাম, কিন্তু হেরা গুহা তখনও দেখা হয়নি। আমাদের খলিল চাচা—আমার উস্তাদ মাওলানা আবুল ফারাহ সাহেবের ছোট ভাই—তখনও মক্কায় থাকতেন। সাক্ষাতের পর যখন জানতে পারলেন যে, মক্কা যিয়ারাহ শেষ অথচ এখনো হেরা গুহা দেখা হয়নি, তখনই তিনি গাড়ি ঠিক করে আমাকে জাবালে নূরের পাদদেশে নিয়ে গেলেন। উপরে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, “ঐ যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটাই হেরা গুহা, যেখানে পবিত্র কুরআন নাযিলের সূচনা হয়েছিল।”
হেরা গুহা দেখে ফেরার পথে খলিল চাচা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন মক্কার আযিযিয়া এলাকার একটা মোবাইলের দোকানে। সেখান থেকে আমার নববিবাহিতা স্ত্রীর জন্য কিনেছিলাম একটা Nokia 6600। সেই ছোট্ট উপহারটা হাতে নিয়ে ফেরার পথে মনের মধ্যে অন্যরকম একটা আনন্দ কাজ করছিল—দূরে থেকেও প্রিয়জনের জন্য কিছু একটা নিয়ে যাওয়ার তৃপ্তি।
আলহামদুলিল্লাহ, প্রিয় খলিল চাচা—আপনার সেই আন্তরিকতা আজও মনে করিয়ে দেয় কতটা নিঃস্বার্থভাবে মানুষ অন্যের জন্য সময় বের করতে পারে। পরবর্তীতে বহুবার সরাসরি সেই গুহায় প্রবেশ করেছি, কিন্তু দূর থেকে আপনার আঙুলের ইশারায় দেখা সেই প্রথম দৃশ্যটাই আজও চোখে ভাসে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে।
ছয়-সাত দিন মক্কায় অবস্থানের পর রওনা হলাম মদিনার উদ্দেশ্যে। মদিনায় আমাদের হোটেল ছিল বাঙালি মার্কেট এলাকায়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় রাত হয়ে গিয়েছিল, ইশার জামাতও শেষ। হোটেলে গিয়ে কোনোরকমে লাগেজ রেখেই ছুটলাম মসজিদে নববির দিকে—বসে থাকার মতো সময় তখন হাতে ছিল না।
মসজিদে নববির দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারে প্রথমে একটু পানি পান করলাম। তারপর একটা ছবি তুললাম—সেই ছবিটা আজও আমার কাছে আছে, বছরের পর বছর ধরে সেই মুহূর্তটাকে ধরে রেখেছে। অজু করে ইশার সালাত আদায় করলাম। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পেশ করলাম।
আজ এত বছর পরও সেই মুহূর্তগুলো স্পষ্ট মনে আছে। হয়তো তখন পুরো বিষয়টা ঠিকভাবে উপলব্ধিই করতে পারিনি। বারবার নিজেকে বলছিলাম—
যে শহরের নাম এতদিন শুনে এসেছি, যে শহরের কথা বইয়ের পাতায় পাতায় পড়েছি, যে শহরের জন্য কত মানুষকে কাঁদতে দেখেছি—আমি আজ সেই শহরে দাঁড়িয়ে আছি। সেদিন রাতে হোটেলে ফিরলাম মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে।
দুই-একদিন পর মদিনার বিভিন্ন স্থান জিয়ারত করলাম। এর মাঝে ঘটল আরেকটা ঘটনা, যেটা তখন হয়তো ছোট্ট একটা মুহূর্ত মনে হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে আমার জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যাবে, তা তখন কল্পনাও করতে পারিনি।
মদিনায় থাকা অবস্থায় আমাদের কয়েকজন হাজীর পাসপোর্ট একটি কোম্পানি নিয়ে রেখেছিল, সেই সংক্রান্ত কিছু কাজে সাহায্য করেছিল আমার ছোটবেলার বন্ধু সৈয়দ যুবাইর আহমাদ। আমরা একসঙ্গে যশোরের দড়াটানা মাদরাসায় পড়াশোনা করেছি। তখন (২০১২) সে পড়ত মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বন্ধু যুবায়ের একদিন আমাদেরকে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেলেন। তার রুমে বসলাম। খুব যত্ন করে আপ্যায়ন করল। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টা ঘুরে দেখলাম, সেই শান্ত, জ্ঞানভরা পরিবেশ অনুভব করলাম।
আর সেদিনই কেন জানি মনের গভীরে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা প্রবলভাবে জেগে উঠল—যদিও এই উমরাহ সফরের আগেই মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশীপের আবেদন জমা দিয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, আহা! যদি কোনো দিন এখানে পড়তে পারতাম! যদি আল্লাহ একটু সুযোগ দিতেন।
তখন এটা ছিল নেহাতই একটা ইচ্ছা, একটা লুকানো স্বপ্ন।
মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে ২০১৭ বা ২০১৮ সালের দিকে আমি নিজেই সেই একই রুমে—যুবাইরের রুমে—থেকে পড়াশোনা করেছি, ততদিনে যুবাইরের লেখাপড়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন যুবাইরের রুমে বসে কল্পনাও করিনি যে, কয়েক বছর পর এই রুমটাই হবে আমার নিজের ঠিকানা।
জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যেগুলো ঘটার সময় আমরা তার গুরুত্ব বুঝি না। অনেক পরে গিয়ে মনে হয়—আচ্ছা, তাহলে গল্পটা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল!
মদিনায় সময় কীভাবে যে ফুরিয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি। এবার ফেরার পালা।
দুইটি মাইক্রোবাসে আমাদের হাজীরা উঠলেন, চলে এলাম মদিনা এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে গালফ এয়ারের ফ্লাইটে বাহরাইন, বাহরাইন থেকে বাংলাদেশ। আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে সুন্দরভাবে নিজের বাসায় ফিরে এলাম।
কিন্তু বাসায় ফেরার পর ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জেঁকে বসল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা দীর্ঘ স্বপ্ন দেখে সবেমাত্র জেগে উঠেছি, আর হঠাৎ করেই সেই স্বপ্নটা ভেঙে গেছে।
আমি কি সত্যিই মক্কায় গিয়েছিলাম?
আমি কি সত্যিই কাবা দেখেছি?
আমি কি সত্যিই মদিনায় গিয়েছিলাম?
মসজিদে নববিতে সালাত আদায় করেছি?
মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছি?
দুই-তিন দিন ধরে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিলাম, সেখান থেকে বের হতে পারছিলাম না। সঙ্গে ছিল একটা চাপা আফসোস—মনে হচ্ছিল, ঠিকমতো কিছুই করতে পারিনি। ইবাদাত-বন্দেগি যতটুকু করার কথা ছিল, তার কতটুকুই বা করতে পেরেছি? অনেক কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেন পুরো সফরটা শেষ হয়ে গেল।
তখন আল্লাহর কাছে বারবার একটাই দোয়া করতাম—
“আল্লাহ, আমাকে আরেকবার মক্কা-মদিনায় যাওয়ার সুযোগ দিন। এবার যেন একটু বুঝে যেতে পারি। একটু সময় নিয়ে থাকতে পারি।”
আল্লাহ তা’আলা সেই দোয়া কবুল করেছিলেন। আবার যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন—তবে আমি যেভাবে ভেবেছিলাম, ঠিক সেভাবে নয়। আমি ভেবেছিলাম, আবার একজন মুসাফির হয়ে মক্কা-মদিনায় যাব। কিন্তু আল্লাহ এমন এক সুযোগ করে দিলেন, যাতে আমি সরাসরি মদিনার বাসিন্দাই হয়ে গেলাম। সেই গল্পটা অবশ্য থাকুক অন্য কোনো দিনের জন্য।
এত সুন্দর একটা সফর, এত স্মৃতি—তারপরও কিছু বিষয় আমার ভালো লাগেনি। আজ এত বছর পরও সেগুলো স্মৃতিতে স্পষ্ট।
আমরা যারা একসঙ্গে গিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে কয়েকজনের আচরণ দেখে মনে হয়েছিল, তাঁরা হয়তো এই সফরের প্রকৃত মাহাত্ম্যটা ঠিকভাবে উপলব্ধি করছেন না। অনেকের কথাবার্তা বা আচরণে একধরনের সুর ফুটে উঠত—”আমরা তো টাকা দিয়ে এসেছি।”
হ্যাঁ, টাকা তো সবাই দিয়েছেন। কিন্তু আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি? কিসের জন্য যাচ্ছি? এই প্রশ্নটাও তো সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়েছিল, এই সফরটা জীবনের অন্য সব সফরের মতো নয়—এখানে আচার-আচরণে, কথাবার্তায়, একে অপরের সঙ্গে ব্যবহারে অন্তত কিছুটা ভিন্নতা থাকা উচিত ছিল।
নিজের অবস্থান নিয়েও একটা টানাপোড়েন কাজ করেছিল। শ্বশুর আব্বুর সঙ্গে গিয়েছিলাম বলে হয়তো কেউ কেউ আমাকে শুধু তাঁর পরিবারের একজন সদস্য হিসেবেই দেখতেন। কিন্তু আমিও তো নিজের শ্রমের টাকায় উমরাহ করতে গিয়েছিলাম, কারও ফ্রি প্যাকেজে নয়। হ্যাঁ, শ্বশুর আব্বু আমার খাবারের টাকা নেননি, সেটা তাঁর ভালোবাসা। কিন্তু উমরাহর সিদ্ধান্ত আর তার পেছনে আল্লাহর রহমত অতপর আমার নিজের পরিশ্রমের গল্পও কম ছিল না। হয়তো বয়স কম ছিল বলেই এই বিষয়গুলো তখন একটু বেশিই গায়ে লাগত।
আরেকটা বিষয় আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। অনেক হাজী যেন মুয়াল্লিমকে নিজের ব্যক্তিগত কর্মচারী মনে করতেন। একজন বলছেন, “আমার সঙ্গে দোকানে যেতে হবে।” আরেকজন বলছেন, “না, আগে আমার কাজটা করে দিতে হবে।” মুয়াল্লিম একজনকে সময় দিলে আরেকজন বিরক্ত হয়ে পড়তেন। সবারই চাওয়া—মুয়াল্লিম যেন শুধু তাঁর সঙ্গেই থাকেন।
তখন বয়স কম ছিল, তাই অনেক কিছু বুঝছিলাম, আবার অনেক কিছু হয়তো পুরোপুরি বুঝতামও না। কিন্তু মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেত—আমরা কোথায় এসেছি, আর কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি! মক্কা-মদিনার মতো জায়গায় এসে যদি আমরা সারাক্ষণ নিজেদের ছোটখাটো চাওয়া-পাওয়া, রাগ-অভিমান আর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েই মগ্ন থাকি, তাহলে গোটা সফরের আসল উদ্দেশ্যটাই বা কোথায় থাকে।
আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, হয়তো এই প্রথম সফরের অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীতে আমার জীবনের অনেক কিছু বুঝতে সাহায্য করেছে। তখন জানতাম না, কয়েক বছরের মধ্যেই আমি নিজেই হাজীদের নিয়ে কাজ করব। জানতাম না, একদিন বাংলাদেশ হজ মিশনের মদিনা শাখায় কাজ করার সুযোগ হবে। জানতাম না, মানুষের হজ-উমরাহ সফর, তাদের সমস্যা, তাদের চাওয়া-পাওয়া—এসব এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ একদিন আমার হবে।
তখন আমি শুধু একজন বাইশ বছরের তরুণ, নিজের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে জীবনের প্রথম উমরাহ করতে গিয়েছিলাম। (এই কথাটা বলার একটাই উদ্দেশ্য—আপনাদের একটু অনুপ্রাণিত করা, যেটা আছে সেটা দিয়ে আল্লাহর ঘর যিয়ারত করা।)
মক্কা থেকে ফিরেছিলাম। মদিনা থেকে ফিরেছিলাম। তারপর বহুদিন বসে বসে ভাবতাম—আমি কি সত্যিই সেখানে গিয়েছিলাম? আর আল্লাহর কাছে শুধু একটাই কথা বলতাম—
“আল্লাহ, আমাকে আরেকবার সুযোগ দিন।”
তিনি সুযোগ দিয়েছিলেন।
তবে সেই সুযোগের গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বরং আমার মনে হয়, আসল গল্পটা সেখান থেকেই শুরু।
চলবে…
— খালিদ আব্দুল্লাহ
ফাউন্ডার অ্যান্ড ম্যানেজিং পার্টনার, ফ্লাই রিহলাহ এভিয়েশন