পবিত্র মক্কা নগরী মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু। আর এই নগরীর মধ্যমণি পবিত্র কাবাঘরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বরকতময় পানির উৎস—জমজম কূপ। এটি শুধু একটি পানির কূপ নয়; বরং তাওহিদ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা এবং তাঁর অসীম কুদরতের এক জীবন্ত নিদর্শন।

হাজীগণ পবিত্র কাবাঘরকে বাম দিকে রেখে যে স্থানে সাতবার চক্রাকারে তাওয়াফ করেন, সেই স্থানকে বলা হয় মাতাফ। অনেকের অজানা হলেও ঐতিহাসিকভাবে জমজম কূপের অবস্থান এই মাতাফ এলাকার ঠিক নিচেই। আজকের দিনে জমজম কূপ চোখের আড়ালে থাকলেও মাত্র দুই দশক আগেও এর দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২০০৩ সালের আগে পর্যন্ত হজ ও উমরাহ পালনকারীরা সরাসরি জমজম কূপ দেখার সুযোগ পেতেন। হাজরে আসওয়াদ বরাবর মাতাফ এলাকার কিছুটা পেছনে নিচে নামার জন্য একটি সিঁড়ি ছিল। সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলে জমজম কূপের অভ্যন্তরীণ অংশ দেখা যেত। কূপ থেকে মোটা পাইপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা হতো, আর সেই দৃশ্য সাধারণ হাজীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

জমজম কূপ
২০০৩ সালের আগে এই দিক দিয়ে জমজম কূপের নিকট যেতে হতো।

পাশেই ছিল জমজম ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দপ্তর। কাচে ঘেরা সেই অফিসে কর্মরত কর্মকর্তাদের কার্যক্রমও দেখা যেত। অবিরাম পানির প্রবাহ, পাম্পের যান্ত্রিক শব্দ এবং চারপাশের পবিত্র পরিবেশ—সব মিলিয়ে সেটি ছিল এক অনন্য দৃশ্য, যা হাজীদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলত।

সেই সময় মক্কার পরিবেশ ছিল আজকের তুলনায় অনেক বেশি সরল। তাওয়াফ শেষে হাজীরা নিজের হাতে মগ বা পাত্র ভরে জমজম পান করতেন। কেউ কেউ পান করার পাশাপাশি শরীরে পানি ঢালতেন—এটি কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত না হলেও জমজমের বরকতের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল।

জমজম কূপ
এটাই জমজম কূপ

জমজমের পানি নিয়ে মানুষের আবেগ ছিল অত্যন্ত গভীর। অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন দেশ থেকে ইহরামের কাপড় পাঠাতেন, যাতে তা জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে বা ভিজিয়ে আনা যায়। কেউ কেউ এই কাপড় কাফনের জন্য সংরক্ষণ করতেন। এটি শরিয়তের কোনো আবশ্যিক বিধান না হলেও, জমজমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার একটি সামাজিক বাস্তবতা ছিল।

শিশুদের জন্যও সেই পরিবেশ ছিল ভিন্ন রকম। হজ সফরে আসা শিশুরা মাতাফ এলাকার আশপাশে ঘোরাফেরা করত। সে সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ছিল তুলনামূলকভাবে শিথিল, ফলে পুরো এলাকাজুড়ে এক ধরনের স্বাভাবিক গতিশীলতা ও সরলতা বিরাজ করত।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাজীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ২০০৩ সালের হজ মৌসুমের পর সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি জমজম কূপে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মসজিদুল হারামের সম্প্রসারণ এবং মাতাফ এলাকা বড় করার লক্ষ্যে জমজম কূপের প্রবেশপথ বন্ধ করে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে মাটির নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে পুরো জমজম ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়। বর্তমানে জমজমের পানি আল্ট্রাভায়োলেট প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের সাহায্যে কাবা প্রাঙ্গণ ও মসজিদুল হারামের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।

জমজম কূপ
গোল রাউন্ড চিহ্নের নিচে জমজম কুপ। বর্তমান এটা রাউন্ড শেপ নেই, স্কয়ার।

এই আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে নিঃসন্দেহে উন্নত। তবে এর ফলে আজকের হাজীরা আর দেখতে পান না সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য—কূপের ভেতর থেকে পানি ওঠা, পাইপের প্রবাহ, কিংবা নিচে নেমে সরাসরি জমজম কূপ দেখার অভিজ্ঞতা।

জমজমের পানি পান করার ফজিলত: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে

জমজমের পানির ফজিলত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে আমাদের অবহিত করেছেন।

তিনি বলেন:خَيْرُ مَاءٍ عَلَى وَجْهِ الأَرْضِ مَاءُ زَمْزَمَ ‘যমীনের বুকে যমযমের পানি সর্বোত্তম পানি।’ -সহীহুত তারগীব ওয়াত-তারহীব : ১১৬১

অন্য হাদিসে এসেছে, مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ “জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা-ই পূরণ হয়।” – ইবন মাজাহ্‌ : ৩০৬২

অন্য হাদিসে এসেছে: إِنَّهَا مُبَارَكَةٌ، طَعَامُ طُعْمٍٍٍ وَشِفَاءُ سُقْمٍٍ “জমজমের পানি উত্তম পানির মধ্যে সর্বোত্তম; এটি খাদ্যের বিকল্প এবং রোগের জন্য শিফা।”
— মুসলিম : ২৪৭৩।
অন্য হাদিসে এসেছে: طَعَامُ طُعْمٍ إِنَّهَا مُبَارَكَةٌ ‘নিশ্চয় তা বরকতময়, আর খাবারের উপাদানসমৃদ্ধ।’

এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে জমজমের পানি শুধু তৃষ্ণা নিবারণের জন্য নয়; বরং দোয়া, শিফা, বরকত এবং কল্যাণের নিয়ত নিয়ে পান করার জন্য।

হজ ও উমরাহ পালনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

যারা হজ বা উমরাহ পালনের সৌভাগ্য অর্জন করবেন, তাদের জন্য বিশেষভাবে উপদেশ—জমজমের পানি বেশি বেশি পান করুন। সুন্নাহ হলো দোয়ার নিয়ত করে পেট ভরে পান করা।

একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যগত ও বাস্তব পরামর্শ হলো—অতিরিক্ত ঠান্ডা জমজমের পানি পরিহার করা। অনেক সময় দেখা যায়, মসজিদুল হারামের পানির জারগুলো অত্যধিক ঠান্ডা থাকে, যা গলা ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে তাওয়াফ বা সাঈ শেষে।

সেজন্য যে জারগুলোর গায়ে “Not Cool” লেখা থাকে, সেগুলো থেকে জমজম পান করাই উত্তম। এতে সুন্নাহ অনুযায়ী পান করাও সহজ হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে।

Not Cool
Not Cool এই জারের পানি স্বাভাবিক, এটা থেকে পান করুন।

উপসংহার

সময় বদলেছে, দৃশ্য বদলেছে, ব্যবস্থাপনা আধুনিক হয়েছে—কিন্তু জমজমের মর্যাদা, বরকত ও ফজিলত কখনো বদলায়নি। দৃশ্যমান কূপ আজ আর চোখে পড়ে না, তবে জমজম আজও আগের মতোই লক্ষ লক্ষ মুমিনের জন্য রহমত ও শিফার উৎস।

এই ইতিহাস জানা আমাদের জন্য শুধু নস্টালজিয়া নয়; বরং এটি আমাদের ঈমান আরো দৃঢ় করে এবং আল্লাহর কুদরতের প্রতি বিশ্বাসকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে তাঁর পবিত্র ঘর যেয়ারতের তৌফিক দান করুন এবং জমজমের পানি পান করার মাধ্যমে হৃদয় শীতল করুন, আমীন।

-শাইখ খালিদ আব্দুল্লাহ আল-মাদানী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *